“এতো দেশ থাকতে আপনি পড়াশুনার জন্যে চায়না যেতে চান কেন?”
সেশনে আমার কমন কয়েকটি প্রশ্নের মধ্যে এইটা একটা। অনেকের কাছে এর খুব সুন্দর ব্যাখ্যা পাই , তাদের কথার ভঙ্গিমায় বুঝা যায় তারা উচ্চশিক্ষার বিষয়ে জানার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছে।
আবার কিছু উত্তরে মর্মাহতও হই, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে
– “ভাইয়া, আমার IELTS বা Duolingo দেওয়া লাগবে না তাই চায়নায় যাব।”
কি ভয়ংকর উত্তর!
ভয়ংকর কেন বললাম বুঝতে পারছেন না তাই তো? পোস্টটি পড়তে পড়তে বুঝে যাবেন। চলুন…
আমরা একটু চিন্তাও করছি না, কি ভয়ংকর ভাবে আমাদের ক্যারিয়ারগুলোকে আমরা পরিকল্পনা করে থাকি। আমরা এতোটা মরিয়া যে বাহিরে পড়াশুনা করতে যাওয়ার জন্যে, আমাদেরকে যে কেউ যে কোন কিছু বললেই আমরা কনভিন্স হয়ে যায়। অথচ একটু সময় নিয়ে চিন্তা করলেই বুঝতে পারতাম আমাদেরকে কীভাবে টুপি পড়ানো হচ্ছে।
যেকোন বিষয়ে পূর্ব সতর্কতা কিংবা পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়াকে আমরা যথারীতি অবহেলা করে থাকি। হোক সেটা সিলেটের সাদা পাথর চুরি হওয়ার পর সরকারের হস্তক্ষেপ কিংবা মাইলস্টোনের বিমান দূর্ঘটনা! পরিকল্পনার যে কতটা অভাব সেটা আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা দেখলেই বুঝা যায়। একজন ছাত্র হিসেবে এর প্রভাব আপনি কেমন উপলব্দি করেছেন তা কমেন্টে জানাতে পারেন।
আচ্ছা বলুন তো দোষটা কাকে দিবেন?
সরকার? সিস্টেম? নাকি নিজেকে…..?
কারণ জাতিগত স্বভাবের জন্য কারো না কারো ঘাড়ে দোষটা তো চাপাতেই হবে🙂। কনফিউজড থাকলে এখন না হয় আমাকেই দিন, পোস্ট পড়ার পর সঠিক দোষীকে খুঁজে বুঝিয়ে দিবেন।
“ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী টি মারা গেল: The patient had died before the physician arrived. ”
ছোটবেলায় সেই ইংরেজি গ্রামার শিখার সময় উদাহরণ হিসেবে পড়া বাক্যটি আমাদের জীবন ধারাকে এতো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করবে তখন তা ভাবি নি। সেই তোতাপাখির মতো পরীক্ষায় পাশ করার জন্যে দীর্ঘ ১২ বছর যাবৎ পড়া ইংরেজি যদি আসলেই কাজে লাগত তাহলে আজ IELTS Test কিংবা অন্যান্য English Proficiency Test দেওয়াকে এতো ভয় পেতাম না।
আসলে যখনই আমরা এই উদাহরণটি বার বার পরীক্ষার জন্যে মুখস্থ করছিলাম তখনই আমাদেরকে শিক্ষা ব্যবস্থার এক নিষ্ক্রিয় সিস্টেমের অপারেশন থিয়েটারে আস্তে আস্তে মেরে ফেলা হচ্ছিল। কীভাবে তা হয়েছে একটু চিন্তা করলেই বুঝে যাবেন, যেহেতু আপনিই এর রাজ সাক্ষী।
তাই আমাদের আজ English নিয়ে এতো ভয়! যেইটাকে কাজে লাগিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ আপনার দূর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। তারা বলে, “আপনার IELTS দেওয়া লাগবে না, আপনাকে IETLS ছাড়া ওয়ার্ল্ড রেঙ্কিং ১** বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন করিয়ে দিব।”
ওনারা কিন্তু মিথ্যা বলছেন না, ওনারা বা যেকেউ আপনাকে এডমিশন করিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এতে সুদূরপ্রসারী লাভ কি? সত্যি করে বলুন তো সামগ্রিক ভাবে আপনার বা দেশের লাভটা কি হচ্ছে?
সেই ২০০৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যত শিক্ষার্থী চায়নাতে গিয়েছে তাদের ডাটা নিয়ে কোন রিসার্চ নেই। কত শতাংশ শিক্ষার্থী আসলে চীনে পড়াশুনা করে তাদের ক্যারিয়ারকে ঘুছাতে পেরেছে, কত শতাংশ পারে নি, সেটার তথ্য কি আপনি যাচাই করেছেন? আমি নিজেও এর পরিসংখ্যান জানি না, কারণ এর তথ্যগুলো কোথাও খুঁজে পাই নি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে অভিজ্ঞতা বলছে যে পরিমাণ সাফল্যের হওয়ার কথা ছিল, তার ধারে কাছেও আমরা পৌঁছাতে পারিনি।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কেন?
কারণ যোগ্যতাকে সেখানে প্রধান্য দেওয়া হয়নি। একটি ভালো সিস্টেমে পড়াশুনা করতে গেলে একটি ভালো ইনপুট দরকার হয়, আর এর জন্যে প্রয়োজন প্রস্তুতি। একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হিসেবে আপনাকে রেগুলার কমিনিউকেশন করে যেতে হবে ভীনদেশী মানুষদের সাথে। আর আপনার যদি কমন কমিনিউকেশন মাধ্যমেই (ইংরেজি ভাষা) দূর্বলতা থাকে তাহলে কীভাবে নিজের প্রশ্ন, চিন্তাধারা, পরামর্শ, মতামত ইত্যাদি তুলে ধরবেন? আমার মতে একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট কখনওই একাডেমিক রেজাল্ট ভালো করে গেলে সে সার্থক নয়, তাকে সেখানে নেটওয়ার্কিং, টিম কোলাবোরেশান সহ সর্বোপরি নিজেকে ও দেশকে প্রেজেন্ট করতে হয়।
কিন্তু কি দূর্ভাগ্য আমাদের!
কিছু স্বার্থন্বেষী মানুষ টাকার জন্যে একজন স্টুডেন্টকে কোয়ালিফাইড কিনা তা যাচাই না করেই সেখানে পাঠিয়ে দিচ্ছে, এতে করে সে ওই সিস্টেমের সম্পূর্ণ বেনিফিটটা নিতে পারছে না। আর কিছু ক্ষেত্রে তো সিস্টেমই তার জন্য একটি যন্ত্রণার মহাসমুদ্র হয়ে যাচ্ছে।
বিগত ২০টি বছর আমরা চায়নার স্কলারশিপের অপব্যবহার করে আসছি। এতে করে দেখবেন কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশের স্টুডেন্টকে প্রচুর ফিল্ট্রশনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে এভয়েডও করছে।
এই দায় তাহলে কাদের?
বুঝলাম ইউনিভার্সিটিগুলোতে ভর্তি হওয়া জন্য IELTS লাগছে না, কিন্তু সম্পূর্ণ সিস্টেমটা যে ইংরেজিতে অপারেট হয় সেই সিস্টেমের সাথে আমাদের দেশের স্টুডেন্টরা কীভাবে এ্যাডজাস্ট করবে এর কোন বিকল্প ব্যবস্থা কি নেওয়া হয়েছে?
আপনার হাতে সময় থাকার পরেও কেন আপনি একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হওয়ার যে যোগ্যতা তাদেরকে অর্জন করতে হবে তার থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন? একটু করে ChatGPT কে জিজ্ঞাসা করলে সে সম্পূর্ণ আউটলাইন আপনাকে রেডি করে দিবে। তাই বলব-
নিজেকে একটু সময় দিন, একটু চিন্তা করুন। ভেবে তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। আর চিন্তা করুন দোষটা কাকে দিলে নিজের কাজটা আদায় হবে আর পরিবর্তনটাও আসবে।
আপনার সুন্দর ও সার্থক ভবিষ্যতের জন্যে শুভকামনা রইল।